প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: শুক্রবার , ৭ মার্চ , ২০২৫
বিশ্বের অনেক দেশে বাবা-মার সম্মতি ছাড়া অন্যকেউ শিশুদের আদর স্নেহ করতে যাওয়াকে নেতিবাচক হিসাবে দেখলেও বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে 'বড়দের শ্রদ্ধা এবং ছোটদের স্নেহ' বিষয়টা অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত এবং এক ধরনের বাস্তবতা।
অন্যদের আদর স্নেহ অনেক সময় শিশুদের যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে বলেই বিভিন্ন দেশে বিষয়টি নেতিবাচক।
যেমন যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র বা সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি চার জন মেয়ে শিশুর মধ্যে একজন এবং ২০ জন ছেলেশিশুর মধ্যে একজন যৌন হয়রানির শিকার হয়। হয়রানির শিকার হওয়া ৯০ শতাংশই কোনো পরিচিত বা পরিবারের আস্থাভাজন ব্যক্তিদের দ্বারা ঘটে।
বাংলাদেশের আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী ২০২৪ সাল জুড়ে ২৩৪টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা ৬৬টি। এর বাইরে ছেলে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৩৬টি, ধর্ষণচেষ্টা তিনটি।
শিক্ষক পর্যায় থেকে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ৯০টি, অপরিচিতদের দ্বারা ৩৯টি।
বাংলাদেশের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একটি নিবন্ধে গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে নারীদের মধ্যে শতকরা ৩০, পুরুষদের মধ্যে শতকরা ১৬ জন ছোটবেলায় কোনো না কোনো যৌন নির্যাতনের শিকার হয়।
স্বাভাবিক স্পর্শ বা আদর করার ক্ষেত্রে যদি তা কোনো শিশুর জন্য অস্বস্তির কারণ হয় তবে সেটা যৌন নিপীড়নের পর্যায়ে পড়তে পারে।
এছাড়া এমন সংবেদনশীল বিষয়ে সামাজিক ট্যাবু বা গোপনীয়তার সংস্কৃতি কম বয়সে নিপীড়নের শিকার হওয়া ব্যক্তির জন্য মানসিক ট্রমার কারণ হতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
অভিভাবকদের করণীয়
অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় এমন বিষয় নিয়ে অভিভাবকরা বিবেচনায় নিতে বা আলোচনা করতে অস্বস্তি বোধ করেন। অনেক ক্ষেত্রে জানতে পারলেও পরিবারের কাছের মানুষদের সন্দেহ করার বিষয়েও অভিভাবকরা কী করবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পরিচালক ও শিশু অধিকারকর্মী নিশাত সুলতানা বিবিসি বাংলাকে বলেন, অভিভাবকরা যদি এবিষয়ে সচেতনতা না দেখান বা এমন ঘটনা ঘটলে শুধু বিষয়টিকে গোপন রাখার বিষয়ে জোর দেন এবং খারাপভাবে স্পর্শ করা ব্যক্তি যদি পরিবারে অবাধে ওঠাবসা করতে পারেন তাহলে সেটা জীবনভর মা-বাবার ক্ষেত্রে একটা নেতিবাচক মনোভাব বা ট্রমা হিসেবে রয়ে যেতে পারে, বলছেন অধিকারকর্মী নিশাত সুলতানা।
বাংলাদেশে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন তেমন বেশ কিছু বিস্তারিত বুকলেট প্রকাশ করেছে। সেখানে অভিভাবকদের যে বিষয়গুলো বলা হয়––
🙁শিশুর সাথে একা সময় কাটাতে চাওয়া ব্যক্তির বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। অভিভাবক ছাড়া কাউকে, এমনকি শিশুর পছন্দের ব্যক্তির সাথেও বাইরে ঘুরতে দেয়া যাবে না। শিশুদের সাথে ছোট বলে এমন আচরণ মেনে নেয়া যাবে না যাতে তারা অস্বস্তি বোধ করে।
😐মা-বাবা ও অভিভাবকদের মাথায় রাখতে হবে পরিবারের ভেতরে-বাইরে কারো কারো 'অন্যের শরীরে খারাপভাবে হাত দেওয়ার' অভ্যাস থাকতে পারে। যেসব জায়গায় হাত দেয়া উচিত না তেমন জায়গায় হাত দিলে শিশুরা যেন মা-বাবাকে বলে দেয় সেটা শেখাতে হবে।
😐যে ব্যক্তি শিশুদের ব্যক্তিগত জায়গায় স্পর্শ করবে বা শিশুকে দিয়ে তাদের শরীরে এমনভাবে স্পর্শ করার কথা বলবে যেটা শিশুর পছন্দ হবে না, সেক্ষেত্রে শিশুদের বাধা দেয়া শেখাতে হবে।
😐সব বয়সী শিশুর প্রতি নজর রাখতে হবে। শিশু এমন কোনো অভিযোগ করলে সেটা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে।
😐'গুড টাচ-ব্যাড টাচ' বা 'ভালো স্পর্শ, মন্দ স্পর্শ' ধারণার সাথে শিশুকে পরিচিত করিয়ে দিতে হবে।
😐বাচ্চাদের মন খুলে কথা বলা শেখাতে হবে যেন সমস্যার বিষয়ে বলতে তারা ভয় না পায়।
😐যদি তেমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যায় সেক্ষেত্রে শিশুকে আশ্বস্ত করতে হবে যে সে ঘটনার জন্য শিশুটি কোনোভাবে দায়ী নয় এবং নিপীড়নকারী ব্যক্তির এমন আচরণ গ্রহণযোগ্য না।
😐পরিবারের অন্য সদস্য বা পরিচিতদের নিপীড়নকারী ব্যক্তি সম্পর্কে জানাতে হবে যেন তারা নিজ সন্তানদের নিয়ে সতর্ক থাকতে পারেন।
😐ঘটনাকে তুচ্ছ হিসেবে দেখা বা নিপীড়নকারীর পক্ষ নেওয়া যাবে না। আবার এ নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের দুশ্চিন্তা বা প্রতিক্রিয়া বা অতিরিক্ত প্রশ্ন করা থেকেও বিরত থাকতে হবে।
শিশুদের কীভাবে বোঝাতে হবে?
সন্তানদের সুরক্ষার জন্য এ বিষয়গুলো বোঝানোটাও বাবা-মায়ের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
আর 'গুড টাচ ও ব্যাড টাচ' এই ধারণা দিতে প্রায় সব পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরা যেটা উল্লেখ করেন সেটা হচ্ছে শিশুদের ব্যক্তিগত অঙ্গ সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা।
ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে ঠোঁট, গোপনাঙ্গ, পায়ুপথ; মেয়েদের ক্ষেত্রে এই তিন অংশ ছাড়াও বুকের দিকের অংশ।
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফও এই অঙ্গগুলোকে একান্ত ব্যক্তিগত হিসেবে শিশুকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কথা বলে।
তবে একই সাথে এটাও বলা হয় যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেখানে স্পর্শ করার প্রয়োজন হতে পারে। যেমন শিশুর যদি টয়লেটে বা গোসলে সাহায্যের প্রয়োজন হয় এবং ডাক্তারের কাছে স্বাস্থ্যের পরীক্ষার জন্য যেতে হয়।
এক্ষেত্রে নিরাপদ স্পর্শের উদাহরণ হিসেবে বলা হয় যদি দাদা-দাদি বা নানা-নানি কেউ জড়িয়ে ধরে এবং গালে চুমু দেয় বা বন্ধুরা হাই ফাইভ দেয়। তবে অনিরাপদ স্পর্শ হিসেবে ইউনিসেফ উল্লেখ করেছে––
🙇যদি ধরলে ব্যথা লাগে।
🙇যদি এমন জায়গায় ধরা বা স্পর্শ করা হয় যেখানে ধরলে ভালো লাগে না বা যেখানে ধরা উচিত না (ব্যক্তিগত অঙ্গ)।
🙇অস্বস্তি বোধ হয় বা খারাপ লাগে এমনভাবে কেউ ধরলে।
🙇যদি এমনভাবে কেউ ধরে যাতে ভয় বা নার্ভাস লাগে।
🙇যদি তাকে ধরার জন্য বা স্পর্শ করার জন্য শিশুকে জোর করে।
🙇যদি স্পর্শ করে কাউকে এ বিষয়ে বলতে নিষেধ করে, চুপ থাকতে বলে।
🙇যদি স্পর্শের কথা কাউকে বললে তার ক্ষতি করার হুমকি দেয়া হয়
অস্বস্তি বলতে বোঝানো হচ্ছে – মন খারাপ, রাগ, ভয়, লজ্জা।
🙇কেউ এমন করলে যাকে বিশ্বাস করা যায় বা আস্থা রাখা যায় এমন মানুষকে বলতে হবে।