বিবিসি অনুকরণে প্রকাশিত: রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬
ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল সম্রাজ্যের সময়কার সরকারি অনেক নথি পাঠ করে রাজ দরবারের অনেক কাহিনী উন্মোচন করেছেন গবেষকরা। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে লিপিকার, গুপ্তচর আর সচিবদের লেখা সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন নিয়ে গড়ে উঠেছিল 'আখবারাত' নামের এক বিশাল সংকলন। আধুনিক যুগের সংবাদ প্রতিবেদনের আদলে লেখা ওইসব দাপ্তরিক চিঠিতে থাকতো দরবারের নানা অন্তর্দ্বন্দ্ব, সামরিক অভিযান, নিয়োগ, আর্থিক বিষয়াদি আর নানা গুঞ্জনের খবর।
ফারসি ভাষায়, কাগজে বেশ তাড়াহুড়ো করে লেখা এইসব দলিল ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের খবরাখবর আদান-প্রদানের প্রধান মাধ্যম, যেগুলোর মাধ্যমে গোপন তথ্য দেওয়া-নেওয়া যেমন হতো, তেমনই আনুষ্ঠানিক নির্দেশও পাঠানো হতো। আবার খবর আদান প্রদানও হতো।
প্রতিদিন সম্ভবত কয়েক হাজার 'আখবারাত' সম্রাটের দরবার আর প্রাদেশিক প্রশাসনের মধ্যে আদান-প্রদান হতো। এগুলোর মাধ্যমেই সেই সময়ে বিশ্বের প্রায় এক চতুর্থাংশ মানুষের ওপরে শাসন চলতো। প্রতিবেদনগুলো অনেক সময়েই কর্মকর্তাদের সামনে জোর গলায় পড়ে শোনানো হতো – যাতে সম্রাটের দরবার থেকে আসা নির্দেশ সাম্রাজ্যের দূরবর্তী এলাকাতেও পৌঁছে যায়।
দশকের পর দশক ধরে এরকম হাজার হাজার পাতার প্রতিবেদন, নির্দেশনামা আর প্রশাসনিক নথি ভারত আর যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন সংগ্রহশালায় পড়ে ছিল। ইতিহাসবিদরা এই নথিগুলির অস্তিত্বের কথা জানতেন, তবে গভীরে গিয়ে সেগুলো নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন খুব কম গবেষক। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলের ইতিহাসবিদ মুনিস ডি ফারুকি ঠিক সেই কাজটাই করেছেন প্রায় দুই দশক ধরে।
তিনি ২০০৭ সাল থেকে 'আখবারাত-ই দরবার-ই মুআল্লা' (অর্থাৎ মহান রাজদরবারের সংবাদ পত্রিকা) নিয়ে গভীরভাবে গবেষণা করছেন। ওই বিপুলসংখ্যক নথির ভাণ্ডার ভারত আর যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে।
ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসির
এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত ছয় হাজার ৫০০-এরও বেশি পৃষ্ঠার এইসব নথিতে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার তথ্যসূত্র ধরে কাজ করতে গিয়ে মি. ফারুকি রাজপুত্র, সেনাপতি, রাজসভাসদ, রাজ পরিবারের নারী, প্রাসাদ সংশ্লিষ্ট হিজড়া এবং আরও অনেকের কর্মকাণ্ড অনুসরণ করেছেন। তার এই দীর্ঘ গবেষণার ফল প্রকাশিত হতে চলেছে আওরঙ্গজেব বা বাদশাহ আলমগীর এবং সপ্তদশ শতকের শেষভাগের সমসাময়িক ইতিহাস নিয়ে একটি গ্রন্থে।
কোথায় আছে দলিল?
বইটিতে যে শুধু ভারতের সব থেকে বিতর্কিত মুঘল শাসকদের মধ্যে অন্যতম একজন সম্রাটের নতুন একটি ছবি তুলে ধরবে, তা নয়; বিশ্বের বৃহত্তম প্রাক-আধুনিক সাম্রাজ্যগুলোর একটি বাস্তবে কীভাবে পরিচালিত হতো, তারও এক বিরল চিত্র তুলে ধরা হয়েছে সেখানে। মুঘল আমলের ওইসব সংবাদ-প্রতিবেদনের অন্তত চারটি সংগ্রহের কথা জানা যায়। এগুলো রাখা আছে লন্ডন, বিকানের, সিতামাউ আর কলকাতায়। তবে ইতিহাসবিদদের ধারণা, আরও কিছু সংগ্রহ ব্যক্তিগতভাবে কারও সংগ্রহে থেকে থাকতে পারে।
ওইসব নথিগুলোর একটি অংশ জয়পুর দুর্গের ভূগর্ভস্থ ও ঠান্ডা কামরাগুলোতে সংরক্ষিত ছিল। উনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ও ইতিহাস সংগ্রাহক জেমস টড ওই নথিগুলো চেয়ে নিয়েছিলেন, কিন্তু ১৮২৩ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়ার সময়ে সেগুলো আর ফেরত দেননি। পরে অবশ্য তিনি পুরো সংগ্রহটি তুলে দেন রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির গ্রন্থাগারের হাতে। সব থেকে সমৃদ্ধ সংগ্রহটি রয়েছে কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারে। আওরঙ্গজেবের শাসনকাল সংক্রান্ত নথিগুলো ২১টি খণ্ডে সংরক্ষিত হয়েছে সেখানে।
আওরঙ্গজেব ১৬৫৮ থেকে ১৭০৭ সাল পর্যন্ত শাসন করেছিলেন এবং তাকেই সাধারণত সাম্রাজ্যের শেষ সম্প্রসারণবাদী সম্রাট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারে রাখা নথিগুলো একসময়ে ভারতের খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ 'স্যার' যদুনাথ সরকারের ব্যক্তিগত সংগ্রহের অংশ ছিল। সরকারকে আওরঙ্গজেবের সব থেকে প্রামাণ্য জীবনীকার হিসেবে গণ্য করা হয়।
কী আছে নথিতে?
প্রথম নজরে এসব নথির বড় অংশ নিতান্তই সাধারণ বলে মনে হতে পারে, যেখানে নিয়োগ, বিবাদ, সেনাবাহিনীর চলাচল, উপহার, অসুস্থতা এবং অজস্র প্রশাসনিক খুঁটিনাটি তথ্যে ভরা। কিন্তু গবেষক ফারুকির মতে, সবগুলো নথি একসঙ্গে বিবেচনা করলে প্রায় অবিচ্ছিন্ন একটি প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়, যেগুলো থেকে বোঝা যায় কীভাবে একটি সাম্রাজ্য নিজের কর্মকাণ্ডের ওপরে নজর রাখত। আওরঙ্গজেবের সিংহাসনে আরোহণের পর প্রথম দুই দশকের নথিপত্র অবশ্য কিছুটা অসম্পূর্ণ। তবে ১৬৮০-এর দশকের শুরু থেকে সংরক্ষিত নথির পরিমাণ সত্যিই বিস্ময়কর। বহু বছর ধরে প্রায় দৈনন্দিন সংবাদ প্রবাহের ধারাবাহিক তথ্য সেখানে পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে, এসব নথি সম্রাটের প্রায় অর্ধশতাব্দী দীর্ঘ শাসনকালের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময়ের ওপরে আলোকপাত করে।
ফারুকি তার একাডেমিক জীবনের বড় একটি অংশ কাটিয়েছেন সপ্তদশ শতকের শেষভাগের মুঘল সাম্রাজ্য নিয়ে গবেষণা করে। ওই সময়কালটা এমন ছিল, যখন মুঘল সাম্রাজ্য ছিল তার শীর্ষে, তবে একই সঙ্গে ধীরে ধীরে পতনের দিকেও এগিয়ে যাচ্ছিল, যা শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসনের পথ সুগম করে তোলে। সেই যুগটাকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখার সুযোগ ফারুকির সামনে এনে দিয়েছিলো ' আখবারাত'।
গবেষক ফারুকি বলেন, "আখবারাত নিয়ে কাজ করার পুরো অভিজ্ঞতাটাই এমন, যে বারে বারে 'ইউরেকা' বলে ওঠার মতো। সেই সময়ে তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থার গভীরতা আর বিস্তৃতি যেন প্রতি মুহূর্তেই আমাকে বিস্মিত করে তোলে।"
মুনিস ডি. ফারুকি যে সংবাদ-প্রতিবেদনগুলো নিয়ে গবেষণা করেছেন, সেগুলো মূলত জয়পুরের রাজার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছিল।
একই রকমের ধারণা করা হয়, সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নিযুক্ত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে আরও শত শত অভিজাত ব্যক্তি, রাজপুত্ররা ও সরকারি কর্মকর্তারাও একই ধরনের তথ্য পেতেন। এভাবেই গড়ে উঠেছিল আধুনিক বিশ্বের গোড়ার যুগের অন্যতম পরিশীলিত এক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক।
"এত সমৃদ্ধ একটি তথ্য সংগ্রহ ও আদান-প্রদানের ব্যবস্থার কথা ভাবলেই আমি অভিভূত হয়ে যাই," বলেন
ফারুকি। শুধু তথ্যের বিপুল পরিমাণ থেকেই বোঝা যায় যে, প্রাক-আধুনিক যুগের মাপকাঠিতে মুঘল শাসনব্যবস্থা তার সুবিশাল সাম্রাজ্যের ব্যাপারে কী ব্যাপক মাত্রায় ও সুচারুভাবে খবরাখবর রাখতো।
ফারুকির মনে করেন, ওই তথ্যের ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা সবসময়ে সমান ছিল না। তবে লাখ লাখ মানুষের জীবনযাত্রাকে "কখনো ভালোর জন্য, কখনো বা মন্দের জন্য" ওইসব তথ্য ব্যবহৃত হতো।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আওরঙ্গজেবের আমলের সঙ্গে যে ব্যাপক ধর্মান্তরকরণের ধারণা প্রচলিত রয়েছে, তার স্বপক্ষে খুব কম প্রমাণই পেয়েছেন তিনি।
আবার তিনি এই প্রমাণও পেয়েছেন যে সম্রাটের হারেম এবং রাজকীয় খোঁজাদের রাজনৈতিকভাবে যতটা প্রভাবশালী বলে মনে করা হতো, তার থেকেও অনেক বেশি ক্ষমতাবান ছিলেন তারা। সম্রাট আওরঙ্গজেবের মধ্যে আন্তরিকতার অভাব বা কঠোরতা যতটা ছিল বলে মি. ফারুকি মনে করতেন, সেই ধারণাও ভ্রান্ত বলে মনে হয়েছে।
একইসঙ্গে সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে শিখদের মতো বিভিন্ন গোষ্ঠী সম্পর্কে তিনি যে পরিমাণ নেতিবাচক মন্তব্য পাওয়ার আশা করেছিলেন, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক কম উল্লেখ খুঁজে পেয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে একটি ভাষ্য চলে আসছে, যে ১৭১১ সাল নাগাদ শিখ ধর্মগুরু ও শিখ সম্প্রদায়ের ওপরে নির্যাতন চালানোর জন্য আওরঙ্গজেবই দায়ী, তার সঙ্গেও ফারুকির গবেষণা লব্ধ তথ্য মিলছে না।
নাটকীয়ভাবে কোনো নতুন তথ্যের সন্ধান পাওয়ার মাধ্যমে নয়, বরং একই ধরনের তথ্যের পুনরাবৃত্তির ফলেই ফারুকি বেশ কয়েকটি বিষয় আবিষ্কার করেছেন।
ওই সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতেই ফারুকি বারবার দেখতে পান আওরঙ্গজেবের কন্যা জিনাত-উন-নিসার নাম। ইতিহাসবিদরা তার কথা জানতেন, কিন্তু রাজদরবারে তার ভূমিকা সম্বন্ধে খুবই কম লেখা পাওয়া যেতো। তবে ফারুকি জিনাত-উন-নিসাকে নিয়ে পাতার পর পাতা তথ্য খুঁজে পেয়েছেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ফারুকি বুঝতে পারেন যে জিনাত-উন-নিসা মোটেই কোনো গুরুত্বহীন রাজকীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন না।
জিনাত-উন-নিসা ছিলেন একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। জীবনের শেষ পর্বে এসে বয়সের ভারে জীর্ণ আর রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া তার পিতা আওরঙ্গজেবের কাছে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবলম্বন হয়ে উঠেছিলেন জিনাত-উন-নিসা। এরপরেই ফারুকি জিনাত-উন-নিসার নাম উল্লেখ আছে এমন প্রতিটি প্রতিবেদন নথিভুক্ত করতে থাকেন। মুঘল হারেম নিয়ে মুনিস ডি. ফারুকির গবেষণা পর্বে জিনাত-উন-নিসা উঠে আসেন এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে।
ফারুকির মতে, আওরঙ্গজেবকে ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হওয়ার যে সুযোগ রয়েছে, তার একটা কারণ হলো তার সম্বন্ধে যে পরিমাণ ঐতিহাসিক উপাদান পাওয়া যাচ্ছে, তার বিশালতা। মুঘল আমলের গোড়ার দিকে সম্রাটদের সম্বন্ধে নথিপত্রের সংখ্যা যখন তুলনামূলকভাবে বেশ কম, তখন আওরঙ্গজেবের শাসনকাল সম্পর্কে তথ্য ভাণ্ডার রীতিমতো এক বিস্ফোরণ। এর মধ্যে যেমন আছে প্রশাসনিক নথি, তেমনই রয়েছে ব্যক্তিগত চিঠিপত্র, আঞ্চলিক ইতিহাস, জীবনীমূলক নথি, কবিতা, ইউরোপীয় বণিকদের নানা দলিল আর পরিব্রাজকদের বিবরণ।
ইতিহাসবিদ মুনিস ডি ফারুকি
ফারুকির কাছে 'আখবারাত' ছিল অপরিহার্য একটি তথ্যের উৎস। তবে তিনি মনে করেন, এই তথ্য ভাণ্ডার আসলে বৃহত্তর এক ঐতিহাসিক সংগ্রহের মাত্র একটি অংশ, যার বড় অংশ এখনো আশ্চর্যজনকভাবে খুব কম ব্যবহৃত হয়েছে।
তিনি বলেন, "যদি অনুসন্ধিৎসু ইতিহাসবিদরা এগুলো কাজে লাগাতে পারেন, তাহলে হয়ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব উপকরণের ওপরে ভিত্তি করে কম করে হলেও ডজনখানেক বই লিখে ফেলা যায়।"
কলকাতায় এই সংগ্রহটি প্রথমবারের মতো যখন তিনি দেখেন, তখনো তিনি জানতেন না যে সামনে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে।
তার মনে আছে, "সংগ্রহের প্রথম খণ্ডের প্রথম পাতাটি আমি যখন উল্টিয়েছিলাম, তখনই আমি অনুধাবন করতে পেরেছিলাম যে কী অসাধারণ এক তথ্যের উৎস আমার সামনে উন্মোচিত হচ্ছে। আমার চোখের সামনে তখনই নানা কাহিনি সূত্র ভেসে উঠেছিলো, যা দীর্ঘকাল ধরে হয় উপেক্ষিত থেকেছে অথবা যে-সব বিষয়ে খুবই কম আলোচনা হয়েছে।
তবে তিনি নিজেই বলছেন যে তার প্রকাশিতব্য বইটিতে ওই বিপুল পরিমাণ তথ্যের খুব সামান্যই তুলে ধরা গেছে।