হোসাইন সাজ্জাদ প্রকাশিত: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও চীনের তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ের (Tianjin University) মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) কেবল ১০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মাস্টার্স ও পিএইচডি অধ্যয়নের সুযোগই তৈরি করেনি, বরং এটি বাংলাদেশ-চীন উচ্চশিক্ষা সহযোগিতার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, শিক্ষক উন্নয়ন, একাডেমিক বিনিময় এবং যৌথ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে এই চুক্তি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা।
১৮৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয় আধুনিক চীনের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। প্রায় ১৩০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠান বর্তমানে চীনের অন্যতম শীর্ষ গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকৌশল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রসায়ন প্রকৌশল, মেটেরিয়ালস সায়েন্স, স্থাপত্য, পরিবেশবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়টির আন্তর্জাতিক সুনাম রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টি চীনের ডাবল ফার্স্ট-ক্লাস ইউনিভার্সিটি (Double First-Class University) প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত, যা দেশটির সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক ও গবেষণাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য সরকারের বিশেষ উদ্যোগ। এর আগে এটি প্রজেক্ট ৯৮৫ এবং প্রজেক্ট ২১১-এরও সদস্য ছিল—যে দুটি কর্মসূচির মাধ্যমে চীন বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিপুল বিনিয়োগ করেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় মূল্যায়ন সংস্থার তালিকায়ও তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্ত অবস্থান রয়েছে। Times Higher Education (THE) World University Rankings 2026-এ বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশ্বের ২০১–২৫০-এর মধ্যে স্থান পেয়েছে। অন্যদিকে QS World University Rankings-এও এটি ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের শীর্ষ ৩০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মেটেরিয়ালস সায়েন্স বিষয়ে এর একাধিক বিভাগ বিশ্বসেরাদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।
ইউজিসির সঙ্গে হওয়া সমঝোতার আওতায় আগামী কয়েক বছরে প্রায় ১০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে এর গুরুত্ব শুধু শিক্ষার্থী পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
চুক্তিতে যৌথ গবেষণা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিনিময়, যৌথ গবেষণাগার স্থাপন, গবেষণা তহবিল, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন এবং একাডেমিক নেটওয়ার্ক তৈরির বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকল্পে অংশগ্রহণ, উন্নত গবেষণাগার ব্যবহারের সুযোগ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের মতো সুবিধা পেতে পারে।
ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ জানিয়েছেন, দেশের প্রায় ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষা শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় দক্ষ শিক্ষক, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন এবং একাডেমিক সহায়তা পাওয়া গেলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা শুধু উচ্চশিক্ষাই নয়, চীনা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা, শিল্পখাত ও আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বাড়তি সুযোগ পাবেন।
বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা যেভাবে বাড়ছে, তাতে চীনা ভাষায় দক্ষ মানবসম্পদের চাহিদাও ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে প্রায় ৭০ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছেন। নতুন সমঝোতার ফলে এই সংখ্যা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিকীকরণ, গবেষণার মানোন্নয়ন এবং বৈশ্বিক একাডেমিক সংযোগ শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানো নয়, বরং যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, গবেষণাগার স্থাপন এবং শিক্ষক উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হলে এই সহযোগিতা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। সাম্প্রতিক বাংলাদেশ-চীন কৌশলগত সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় এই উদ্যোগ শিক্ষা ও গবেষণা খাতে দুই দেশের অংশীদারিত্বকে আরও গভীর করবে বলেই আশা করা হচ্ছে।