সাদিয়া বিনতে সিদ্দিক প্রকাশিত: শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর (২৪-২৬ জুন ২০২৬) বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হতে চলেছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম প্রধান বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়ার পর চীনকে বেছে নেওয়া শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। দালিয়ানে সামার ডাভোস ফোরামে অংশগ্রহণের পর বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংসহ শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক এই সফরকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘ ও বহুমুখী। ১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর থেকে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার ও উন্নয়ন সহযোগী হয়ে উঠেছে। পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, পেয়ারা বন্দরসহ অসংখ্য মেগা প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর অংশ হিসেবে দুই দেশের সহযোগিতা আরও গভীর হয়েছে। তারেক রহমানের এই সফরে এই সম্পর্ককে ‘নতুন উচ্চতায়’ নেওয়ার ঘোষণা শোনা গেছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় বিনিয়োগ ও প্রকল্পের সম্ভাবনা তৈরি করবে।
এই সফরের সবচেয়ে বড় দিক হলো অর্থনৈতিক সহযোগিতা। বাংলাদেশ বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। তিস্তা নদীর জলব্যবস্থাপনা প্রকল্প, বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম (যেমন জে-১০সিই যুদ্ধবিমান) নিয়ে আলোচনা এই সফরে গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানা যায়। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা, শক্তি নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সফরকে অনেকে ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’হিসেবে দেখছেন। বাংলাদেশের অবস্থান ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু একটি দেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে পারবে না, বরং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করতে সক্ষম হবে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হতে পারে। পশ্চিমা দেশগুলোর চাপের মধ্যেও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রমাণ।
তবে এই সফরের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে কিছু প্রকল্পে ঋণের শর্ত, পরিবেশগত প্রভাব এবং স্থানীয় স্বার্থের বিষয়ে উদ্বেগ দেখা গেছে। নতুন চুক্তিগুলোতে স্বচ্ছতা, টেকসই উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া জরুরি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার যদি এসব বিষয়ে সতর্ক থাকে, তাহলে চীন সফরের ফলাফল জাতীয় অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারবে।
এই সফর শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নয়, বরং বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযানের অংশ। চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে সকল প্রতিবেশীর সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য।
তারেক রহমানের চীন সফর বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন, আত্মনির্ভরশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সরকারের দূরদর্শী কূটনীতি এবং বাস্তবমুখী বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশ উপকৃত হবে। এটি শুধু একটি সফর নয়, বরং বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের একটি পদক্ষেপ।