Logo
ঢাকা রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
Logo

সঞ্চয়পত্রে বাড়তি কর মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ে আঘাত, জনবিরোধী

সাদিয়া বিনতে সিদ্দিক প্রকাশিত: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬

শেয়ার করুনঃ
সঞ্চয়পত্রে বাড়তি কর মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ে আঘাত, জনবিরোধী


সম্প্রতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর অগ্রিম করের হার বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে এটি ৫ শতাংশ ছিল এবং উৎসে কর কেটে রাখা ছিল চূড়ান্ত কর দায়। নতুন নিয়মে এটি অগ্রিম করে পরিণত হয়েছে এবং মোট আয়ের সঙ্গে যোগ করে স্ল্যাব অনুযায়ী অতিরিক্ত কর দিতে হতে পারে। 


প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার একদিকে যখন খেটে খাওয়া বেকার মানুষদের জন্য ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা করেছে সেখানে অসহায় প্রবীণ কর্মহীন মানুষের একমাত্র জীবিকা সঞ্চয়পত্রের লাভের উপর নতুন করে করভার  স্ববিরোধীতা এবং দ্বিচারিতা। এই সিদ্ধান্তটি দেশের লাখ লাখ মধ্যবিত্ত, অবসরপ্রাপ্ত, চাকরিজীবী ও সাধারণ সঞ্চয়কারীর জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। 

পত্রিকার মতামত পাতায় এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা জরুরি। কারণ এটি শুধু একটি কর বৃদ্ধি নয় — এটি দেশের সঞ্চয় সংস্কৃতি, মধ্যবিত্তের আর্থিক নিরাপত্তা এবং সরকারের অর্থনৈতিক নীতির একটি বড় পরীক্ষা।


সঞ্চয়পত্র বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বিশেষ করে পরিবার সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষ তাদের কষ্টার্জিত টাকা নিরাপদে রাখেন এবং নিয়মিত মুনাফা পান। বর্তমানে এসব স্কিমে মুনাফার হার ১১.৮০ থেকে ১১.৯৮ শতাংশের মতো। কিন্তু নতুন করারোপের ফলে বাস্তবে হাতে আসা মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। 


উদাহরণস্বরূপ, এক লাখ টাকা বিনিয়োগে মাসিক মুনাফা আগের তুলনায় কয়েকশ টাকা কমে যেতে পারে। পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য যেখানে ৫ শতাংশ কর ছিল, সেখানে এখন ১০ শতাংশ অগ্রিম কর কাটা হবে।


এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সরকারের যুক্তি হলো রাজস্ব বাড়ানো। বাজেটে বড় ঘাটতি (প্রায় দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা) পূরণের জন্য রাজস্ব আয় বাড়ানো দরকার। সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যও রয়েছে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা। করের আওতা বাড়িয়ে, অগ্রিম কর বৃদ্ধি করে সরকার অতিরিক্ত রাজস্ব আশা করছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে — এই বোঝা কার ওপর চাপানো হচ্ছে? ধনীদের সম্পদের ওপর কর বাড়ানোর পরিবর্তে মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া কতটা ন্যায়সঙ্গত?


মধ্যবিত্ত শ্রেণি বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তারা কর দেয়, খরচ করে অর্থনীতিকে চালু রাখে এবং সঞ্চয় করে ভবিষ্যত নিরাপদ করে। ব্যাংক আমানতের সুদের হার তুলনামূলক কম, শেয়ারবাজার ঝুঁকিপূর্ণ। সঞ্চয়পত্র ছিল তাদের কাছে সবচেয়ে নিরাপদ ও আকর্ষণীয় বিনিয়োগ মাধ্যম। এখন এর আকর্ষণ কমে গেলে মানুষ হয়তো অনানুষ্ঠানিক খাতে বা অন্যত্র টাকা সরিয়ে নেবে, যা সরকারের ঋণ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রাকেই ব্যাহত করতে পারে। অনেক অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, বিধবা, প্রবীণ নাগরিক এই মুনাফার ওপর নির্ভর করে চলেন। তাদের জীবনযাত্রায় এটি সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।


অর্থনীতিবিদদের অনেকে বলছেন, এই কর বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির এই সময়ে মধ্যবিত্তকে আরও চাপে ফেলবে। ইতোমধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়েছে, ব্যয় বেড়েছে। সঞ্চয়ের রিটার্ন কমলে মানুষের সঞ্চয় প্রবণতা কমবে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় সঞ্চয় হ্রাস করবে। এছাড়া কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও সরলতা না থাকলে করদাতাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়বে।


তবে সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, রাজস্ব বাড়ানো ছাড়া বড় বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন। উন্নয়ন প্রকল্প, ভর্তুকি, বেতন-ভাতা — সবকিছুর জন্য টাকা দরকার। যদি কর ফাঁকি কমানো, ট্যাক্স নেটওয়ার্ক বাড়ানো এবং ধনীদের ওপর অধিক করারোপের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানো যায়, তাহলে সঞ্চয়পত্রের মতো জনপ্রিয় মাধ্যমে অতিরিক্ত চাপ না দিলেও হয়। সরকারকে অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে যে, অতিরিক্ত করারোপ যেন সঞ্চয় সংস্কৃতিকে নিরুৎসাহিত না করে।

এই পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত একটি সুষম ও সহনশীল নীতি গ্রহণ করা। ছোট বিনিয়োগকারীদের (যেমন পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত) জন্য করের হার কম রাখা, প্রবীণ ও পেনশনারদের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া এবং সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা দরকার। একই সঙ্গে করদাতাদের সুবিধা বাড়াতে ডিজিটালাইজেশন, স্বচ্ছতা এবং সহজ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।


সঞ্চয়পত্র জনগণের আস্থার প্রতীক। এর ওপর অযাচিত বোঝা চাপিয়ে দিলে সেই আস্থা নষ্ট হতে পারে। সরকারের উচিত এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে মধ্যবিত্তের স্বার্থ রক্ষা করা। অন্যথায় এটি শুধু রাজস্ব বাড়াবে না, বরং জনগণের অর্থনৈতিক আস্থা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযানে মধ্যবিত্তকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে হবে — করের নামে তাদেরকে দুর্বল করে নয়।

Campus Mirror
শেয়ার করুনঃ

এই বিভাগের আরোও খবর

  • বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক:  প্রত্যাশা, সম্ভাবনা ও ব্যক্তিগত ভাবনা
    বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক: প্রত্যাশা, সম্ভাবনা ও ব্যক্তিগত ভাবনা
  • ইমেরিটাস বিতর্ক, রাজনৈতিক পরিচয়, নাকি বিধিবিধানের প্রয়োগ
    ইমেরিটাস বিতর্ক, রাজনৈতিক পরিচয়, নাকি বিধিবিধানের প্রয়োগ
  • প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের নতুন অধ্যায়
    প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের নতুন অধ্যায়
  • ইরান যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি বিশ্বশান্তির নতুন সম্ভাবনা
    ইরান যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি বিশ্বশান্তির নতুন সম্ভাবনা
  • রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান, একজন পেশাদার কূটনীতিক
    রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান, একজন পেশাদার কূটনীতিক
  • ইবি ছাত্র নেতাদের ঈদ ভাবনা
    ইবি ছাত্র নেতাদের ঈদ ভাবনা
  • অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নিচ্ছে জবি ছাত্রদল
    অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নিচ্ছে জবি ছাত্রদল
  • বাড়ি ফেরাতেই ঈদের আমেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মাঝে
    বাড়ি ফেরাতেই ঈদের আমেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মাঝে
Logo