Logo
ঢাকা রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
Logo

ইমেরিটাস বিতর্ক, রাজনৈতিক পরিচয়, নাকি বিধিবিধানের প্রয়োগ

হোসাইন সাজ্জাদ প্রকাশিত: শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬

শেয়ার করুনঃ
ইমেরিটাস বিতর্ক, রাজনৈতিক পরিচয়, নাকি বিধিবিধানের প্রয়োগ

 

বাংলাদেশের চিকিৎসা অঙ্গনে অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ একটি সুপরিচিত নাম। প্রায় পাঁচ দশকের চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা এবং মেডিসিন বিষয়ে বাংলা ভাষায় পাঠ্যগ্রন্থ রচনার মাধ্যমে তিনি দেশের অন্যতম প্রভাবশালী চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত। বহু প্রজন্মের চিকিৎসকের শিক্ষক হিসেবেও রয়েছে তার বিশেষ পরিচিতি।

সম্প্রতি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) তার আজীবন ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ বাতিল করে ২০২৪ সালের ২০ জুন থেকে নেওয়া বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পর চিকিৎসক সমাজ, একাডেমিক মহল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছেএই সিদ্ধান্ত কি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ, নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধান অনুসারে নেওয়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ?

একজন চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পেশাগত দক্ষতা, চিকিৎসাসেবা, গবেষণা ও শিক্ষাদান। তিনি কোনো রাষ্ট্রনায়ক, রাজনৈতিক নেতা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির চিকিৎসক ছিলেনএটি তার পেশাগত দায়িত্বের অংশ হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী কিংবা বিরোধী দলের নেতাদের ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা চিকিৎসকদের পেশাগত পরিচয়ের অংশ; সেটি নিজেই কোনো অপরাধ বা অযোগ্যতার কারণ নয়।

অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ দীর্ঘদিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে কেবল এই পরিচয়কে কেন্দ্র করে তার ইমেরিটাস মর্যাদা বাতিল করা হলে সেটি চিকিৎসা পেশার মূল্যায়নের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে বলে মনে করছেন অনেকেই।

বিএমইউর অফিস আদেশে অবশ্য রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো উল্লেখ নেই। সেখানে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ২০ জুন অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯২তম সিন্ডিকেট সভায় ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ সংশোধন করা হয় এবং একই সভায় সেই সংশোধিত বিধির আওতায় অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহকে আজীবন ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, একই সিন্ডিকেট সভায় প্রথমে অধ্যাদেশ সংশোধন এবং পরে সেই সংশোধিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া বিধিসম্মত নয়। এ কারণেই ওই নিয়োগকে বিধিবহির্ভূত ঘোষণা করে বাতিল করা হয়েছে।

এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মূল বিতর্ক তিনটি বিষয়ে।

প্রথমত, ২০২৪ সালের ৯২তম সিন্ডিকেট সভাটি মূলত বাজেট অধিবেশন ছিল। অভিযোগ রয়েছে, সভার নির্ধারিত আলোচ্যসূচির বাইরে একজন সদস্যের প্রস্তাবে ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ অধ্যাদেশ সংশোধন করা হয়।

দ্বিতীয়ত, একই সভায় সংশোধিত অধ্যাদেশ কার্যকর করে অধ্যাপক আবদুল্লাহকে আজীবন ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের মতে, একই সভায় বিধি সংশোধন ও সেই বিধির অধীনে নিয়োগ অনুমোদন প্রশাসনিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

তৃতীয়ত, অভিযোগ রয়েছে যে আজীবন সম্মানী ও অন্যান্য সুবিধা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ বিভাগের বাধ্যতামূলক অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

তবে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ আইনি ভিত্তি প্রকাশ্যে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে অনেকের প্রশ্ন, কোন ধারা বা অধ্যাদেশ লঙ্ঘিত হয়েছে এবং সেই ব্যাখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের সুযোগ থাকা উচিত।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে অধ্যাপক আবদুল্লাহকে তিন বছরের জন্য ইমেরিটাস অধ্যাপক করা হয়েছিল এবং মাসিক সম্মানী ছিল ৩০ হাজার টাকা।

পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জুনে তাকে আজীবন ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয়। সেই নিয়োগে অবসরকালীন গ্রেড-১ অধ্যাপকের বেতন-ভাতার সমপরিমাণ সুবিধা নির্ধারণ করা হয়, যদিও পেনশন সমন্বয়ের পর মাসিক প্রায় ৩০ হাজার টাকা সম্মানী পাওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি অফিস, জনবলসহ অন্যান্য প্রশাসনিক সুবিধার ব্যবস্থাও রাখা হয়।

বর্তমান প্রশাসনের দাবি, এই দ্বিতীয় নিয়োগ প্রক্রিয়াতেই বিধিগত ত্রুটি ছিল।

সিদ্ধান্তের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলোইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে পাওয়া বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্তি, যেহেতু নিয়োগটিই বিধিবহির্ভূত হিসেবে বাতিল হয়েছে এবং ওই সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো একাডেমিক বা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেননি, তাই প্রদত্ত সম্মানী ফেরত চাওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে অধ্যাপক আবদুল্লাহ এটিকে অন্যায্য ও অপমানজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তার ভাষায়, এটি প্রতিহিংসামূলক সিদ্ধান্ত এবং বেতন ফেরত চাওয়ার মাধ্যমে 'সবচেয়ে নিচু মানসিকতার' পরিচয় দেওয়া হয়েছে।

এই ঘটনাটি শুধু একজন চিকিৎসকের নিয়োগ বাতিলের বিষয় নয়; এটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, বিধিবিধান, স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে এনেছে।

যদি সত্যিই নিয়োগে বিধি লঙ্ঘন হয়ে থাকে, তাহলে সেই অনিয়মের দায় কেবল নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির নয়; যারা সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাদের ভূমিকাও সমানভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে।

আবার যদি বিধি লঙ্ঘনের ব্যাখ্যা দুর্বল হয় বা তা রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাছাই করে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বিতর্কের স্থায়ী সমাধান হতে পারে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিতইমেরিটাস নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ ও সংশোধনী প্রকাশ করা। কোন ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে, তার আইনি ব্যাখ্যা জনসমক্ষে তুলে ধরা। অর্থ বিভাগের অনুমোদনসংক্রান্ত নথি প্রকাশ করা।

প্রয়োজনে স্বাধীন আইনি মতামত বা প্রশাসনিক পর্যালোচনা প্রকাশ করা।

অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর দীর্ঘ চিকিৎসা ও শিক্ষাজীবনের অবদান নিয়ে খুব কমই দ্বিমত রয়েছে। একই সঙ্গে কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিধিবিধান মেনে নিয়োগ হওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অতএব এই বিতর্ককে ব্যক্তি বনাম ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে, আইনের শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং মেধার মর্যাদার আলোকে মূল্যায়ন করাই হবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ।

Campus Mirror
শেয়ার করুনঃ

এই বিভাগের আরোও খবর

  • বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক:  প্রত্যাশা, সম্ভাবনা ও ব্যক্তিগত ভাবনা
    বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক: প্রত্যাশা, সম্ভাবনা ও ব্যক্তিগত ভাবনা
  • সঞ্চয়পত্রে বাড়তি কর মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ে আঘাত, জনবিরোধী
    সঞ্চয়পত্রে বাড়তি কর মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ে আঘাত, জনবিরোধী
  • প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের নতুন অধ্যায়
    প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের নতুন অধ্যায়
  • ইরান যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি বিশ্বশান্তির নতুন সম্ভাবনা
    ইরান যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি বিশ্বশান্তির নতুন সম্ভাবনা
  • রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান, একজন পেশাদার কূটনীতিক
    রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান, একজন পেশাদার কূটনীতিক
  • ইবি ছাত্র নেতাদের ঈদ ভাবনা
    ইবি ছাত্র নেতাদের ঈদ ভাবনা
  • অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নিচ্ছে জবি ছাত্রদল
    অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নিচ্ছে জবি ছাত্রদল
  • বাড়ি ফেরাতেই ঈদের আমেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মাঝে
    বাড়ি ফেরাতেই ঈদের আমেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মাঝে
Logo