নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬
সনদ ও জিপিএনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে মেধা, দক্ষতা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধকে শিক্ষার মূল ভিত্তিতে পরিণত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকেই পাঠ্যক্রমে নতুন বিষয় যুক্ত করার পাশাপাশি ২০২৮ সাল থেকে পুরো শিক্ষাক্রমে ব্যাপক সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকারের শিক্ষা সংস্কারের এই উদ্যোগে কেবল পাঠ্যবই পরিবর্তন নয়, শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করা, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বিকল্প শিক্ষায় যুক্ত করা, শিক্ষকদের ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানো, বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণামুখী করা এবং শিক্ষা ও শিল্প খাতের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সরকারের এসব পরিকল্পনার কথা জানান।
জিপিএ-৫ নয়, গুণগত শিক্ষায় জোর
সরকারের পরিকল্পনার অন্যতম বড় পরিবর্তন হচ্ছে পরীক্ষার ফলাফলকে শিক্ষার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে না দেখে শিক্ষার্থীর প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া। উপদেষ্টা মাহদী আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের সরকারের সময়ে ফলাফলের পরিসংখ্যান ভালো দেখানোর প্রবণতায় জিপিএ-৫ পাওয়ার হার কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়েছিল।
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গ্রেস নম্বর না দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, এবার শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকৃত ফল পেয়েছে।
এই অবস্থান থেকে সরকারের নতুন শিক্ষাদর্শের মূল লক্ষ্য হচ্ছে—ভালো ফলের পাশাপাশি শিক্ষার্থী বাস্তবে কী জানে, কী করতে পারে এবং কর্মক্ষেত্রে সেই জ্ঞান কীভাবে প্রয়োগ করতে পারে, তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া।
২০২৭ থেকেই নতুন বিষয়, বড় পরিবর্তন ২০২৮-এ
পুরো শিক্ষাক্রম পুনর্গঠনের আগে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষকে একটি অন্তর্বর্তী ধাপ হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার। আগামী বছর থেকেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে নতুন কিছু বিষয় যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
চতুর্থ শ্রেণি থেকে ‘স্পোর্টস অ্যান্ড কালচার’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘টেকনিক্যাল এডুকেশন’ যুক্ত করার কথা জানিয়েছেন উপদেষ্টা। একই সঙ্গে রোবটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে বড় পরিবর্তনটি আসবে ২০২৮ সালে। ওই শিক্ষাবর্ষ থেকে পুরো কারিকুলামে ব্যাপক ও বিস্তৃত সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক কর্মবাজার ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি টেকসই ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম তৈরি করা।
ফেল করা শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প পথ
চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার পর তাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন নীতির কথা জানিয়েছে সরকার। শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ঝরে পড়া বা পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের শুধু ব্যর্থ হিসেবে বিবেচনা না করে তাদের কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার মাধ্যমে কর্মমুখী করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার, স্বল্পমেয়াদি কারিগরি কোর্স ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি প্রয়োজনে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে আর্থিক সহায়তার কথাও বলা হয়েছে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সাধারণ শিক্ষার বাইরে থাকা তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানমুখী একটি বিকল্প শিক্ষাপথ তৈরি হতে পারে।
শিক্ষার্থী থেকে সরাসরি কর্মসংস্থানে
শিক্ষা শেষ করেও চাকরি না পাওয়ার সমস্যাকে মোকাবিলায় বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ চালুর পরিকল্পনা সরকারের আরেকটি নতুন উদ্যোগ।
এই ব্যবস্থায় চাকরিপ্রার্থীরা নিজেদের দক্ষতা ও যোগ্যতার তথ্য নিবন্ধন করতে পারবেন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ জনবল খুঁজে নিতে পারবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় পর্যায়ে এটি চালু করে পরে জেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হবে।
ফলে শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে যে দীর্ঘদিনের দূরত্ব রয়েছে, তা কমানোর একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হতে পারে।
‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’
শিক্ষার মানোন্নয়নে শুধু শিক্ষার্থীর পাঠ্যক্রম পরিবর্তন নয়, শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে প্রাথমিক থেকে সব পর্যায়ের শিক্ষকদের হাতে ডিজিটাল ট্যাব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অর্থাৎ নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষককেও নতুন প্রযুক্তি ও পদ্ধতির সঙ্গে সমানভাবে প্রস্তুত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণার সঙ্গে শিল্পের সংযোগ
উচ্চশিক্ষায়ও পরিবর্তনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু ডিগ্রি প্রদানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে না রেখে গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদেশে থাকা বাংলাদেশি গবেষক ও শিক্ষকদের দেশে ফিরিয়ে এনে ‘ব্রেন ড্রেন’কে ‘ব্রেন সার্কুলেশনে’ রূপান্তরের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন মাহদী আমিন। গবেষণায় সরকারি বরাদ্দ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
শহর-গ্রামের শিক্ষাবৈষম্য কমানোর উদ্যোগ
শিক্ষার সুযোগে শহর ও গ্রামের বৈষম্য কমাতেও প্রতিযোগিতাভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দেশব্যাপী প্রাইমারি স্কুল গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট এবং ইনোভেশন ও স্টার্টআপ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের প্রতিভা জাতীয় পর্যায়ে তুলে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর মাধ্যমে শুধু রাজধানী বা বড় শহরের শিক্ষার্থীদের নয়, গ্রাম ও প্রান্তিক এলাকার শিক্ষার্থীদেরও জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
পরিবর্তনের কেন্দ্রে ‘মানসম্মত শিক্ষা’
সরকারের প্রস্তাবিত উদ্যোগগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনকে শুধু বই বা পরীক্ষার কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষা, দক্ষতা, প্রযুক্তি, গবেষণা ও কর্মসংস্থানকে একই ধারায় যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
জিপিএ-৫ নির্ভরতার পরিবর্তে প্রকৃত মূল্যায়ন, ২০২৮ সালের নতুন শিক্ষাক্রম, এআই ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিতি, ঝরে পড়াদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ, শিক্ষকদের ডিজিটাল সক্ষমতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প গবেষণা সহযোগিতা—সবগুলো উদ্যোগের লক্ষ্যই শিক্ষাকে আরও বাস্তবমুখী ও কর্মসংস্থানভিত্তিক করা।
তবে এসব উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের সক্ষমতা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শহর-গ্রামের অবকাঠামোগত বৈষম্য কমানোর ওপর। নতুন কারিকুলাম প্রণয়নের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘদিনের পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে দক্ষতা ও জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার দিকে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব হতে পারে।
মাহদী আমিনের ভাষায়, সরকারের লক্ষ্য শুধু সনদধারী প্রজন্ম তৈরি করা নয়; দক্ষতা, কর্মসংস্থান, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা।