আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬
যুদ্ধবাজ মার্কিন সেনেটর, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র লিন্ডসে গ্রাহাম মারা গেছেন। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় শনিবার রাতে তার মৃত্যুর হওয়ার কথা জানিয়েছে তার ব্যক্তিগত কার্যালয়।
গাজায় পারমাণবিক বোমা ফেলার আহ্বানের পাশাপাশি দেশে দেশে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চালানোর পক্ষে সবসময় উচ্চকণ্ঠ ছিলেন এই লিন্ডসে গ্রাহাম। ট্রাম্প যখন ইরানের অবকাঠামো ধ্বংস করে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠানোর মত বক্তব্য দিয়েছিল, তখনও তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি।
তার মৃত্যুর খবর দিয়ে রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলা হয়, “এটা এমন ভালো খবর যে, আমি আপনাদের সামনে আবার পাঠ করতে চাই। ইরান-বিরোধী সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম জাহান্নামে চলে গেছে।”
তার বক্তব্য বহু সময় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ২০২৪ সালের মে মাসে এক সাক্ষাৎকারে গাজায় ইসরায়েলি যুদ্ধকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উদাহরণ টেনে গাজায় পারমাণবিক বোমা ফেলার পরামর্শ দিয়েছিলেন লিন্ডসে গ্রাহাম।
তার ভাষ্য ছিল, জাপান ও জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ করতে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলা যেমন সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল, তেমনি ইসরায়েলের অস্তিত্ব রক্ষায় গাজায় 'যা কিছু প্রয়োজন' তা করার অধিকার তাদের আছে।
২০০২ সালে সর্বপ্রথম সেনেটর নির্বাচিত হওয়া গ্রাহাম যুদ্ধের পক্ষে বক্তব্য দেওয়া এবং বিদেশে গিয়ে সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে সাফাই গেয়ে প্রায় সমালোচনার মুখে পড়তেন।
যুক্তরাষ্ট্র সেনেটের বাজেট কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা, আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধ এবং ইউক্রেইন ও ইরানে সংঘাতের ক্ষেত্রে চেনা মুখ ছিলেন তিনি।
মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া পোস্টে শোক জানিয়েছেন ট্রাম্প। তাকে ‘সত্যিকারের আমেরিকান দেশপ্রেমিক’ হিসাবেও বর্ণনা করেছেন তিনি।
মাত্র কয়েকদিন আগে ইউক্রেইনের রাজধানী কিইভ সফর করেছিলেন তিনি। সেখানে তিনি ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন এবং আলোচনা করেছেন রাশিয়ার ওপর আরও চাপ প্রয়োগ করা যায়, এমন আইন প্রণয়নের বিষয়ে।
ইউক্রেইনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার পক্ষে থাকা মার্কিন কংগ্রেসে যে কয়জন ব্যক্তি আছেন, তাদের মধ্যে সামনের সারিতে ছিলেন তিনি। ২০০৩ সালে তিনি বলেছিলেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ইউক্রেইন ছাড়িয়ে আরও দূরে।
বিবিসিকে তিনি বলেছিলেন, “পুতিন ইউক্রেইনে থেমে থাকবেন না। আপনার জন্য ইউক্রেইনে দুর্বল হওয়া মানে তাইওয়ানে হেরে যাওয়া।”
যুদ্ধবাজ গ্রাহামের যত বিদ্বেষমূলক কাজ
নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে ২০২১ সালে ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটল হিলে হামলার পর ট্রাম্পের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন গ্রাহাম।
তবে, শেষমেশ নিজের অবস্থান থেকে ট্রাম্পের সবচেয়ে নিবেদিতপ্রাণ সমর্থক হয়ে ওঠেন তিনি এবং ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে ট্রাম্পকে সমর্থন দেন।
ক্যাপিটল হিলে হামলার পর সেনেটে দেওয়া বক্তব্যে গ্রাহাম বলেছিলেন, “ট্রাম্প এবং আমি বেশ লম্বা ভ্রমণ করেছি। এভাবে শেষ হওয়াটাকে আমি ঘৃণা করি। আমি শুধু বলতে পারি, আমাকে হিসাবের বাইরে রাখুন। অনেক হয়েছে, অনেক।”
সেই অবস্থান পাল্টে ২০২৩ সালে এসে গ্রাহাম বিবিসিকে বলেন, “ডনাল্ড ট্রাম্পের একটা অন্ধকার দিক আছে… এবং তিনি একজন ভালো প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তবে, আমি তার সঙ্গে আছি, কেননা তিনি কী করেছেন, সেটা আমি দেখেছি।”
মার্কিন কংগ্রেসে সর্বদা ইসরায়েলকে সমর্থন দিতেন গ্রাহাম এবং তেল আবিবের জন্য সামরিক সহায়তার পাশাপাশি অবৈধ ইসরায়েলি বসতির জন্য ত্রাণ সহায়তা বাড়ানোর পক্ষে ওকালতি করতেন তিনি।
তাকে ইসরায়েলের ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ হিসাবে অভিহিত করেছেন করেছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জগ বলেছেন, ইসরায়েলের জন্য গ্রাহামের সমর্থন ছিল অবিচল।
ফিলিস্তিনের গাজায় গণহত্যামূলক যুদ্ধের পুরো সময়ে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের পক্ষ নিয়েছিলেন তিনি এবং ইসরায়েলে মার্কিন সহায়তা বন্ধের ক্ষেত্রে যে কোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছেন।
তার বিভিন্ন মন্তব্যের সমালোচনা এসেছে ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মী এবং মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর তরফে।
ইরানের ঘোর বিরোধী এবং যুদ্ধংদেহি অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন প্রভাবশালী এই সেনেটর।
২০২৪ সালের মে মাসে এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উদাহরণ টেনে গাজায় পারমাণবিক বোমা ফেলার পরামর্শ দিয়েছিলেন লিন্ডসে গ্রাহাম।
তার ভাষ্য ছিল, জাপান ও জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ করতে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলা যেমন সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল, তেমনি ইসরায়েলের অস্তিত্ব রক্ষায় গাজায় 'যা কিছু প্রয়োজন' তা করার অধিকার তাদের আছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর তিনি বার বার যুদ্ধবিরতির আহ্বানের বিরোধিতা করেন। সেই সঙ্গে কোনো শর্ত ছাড়াই ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দিয়ে যাওয়ার জোর দাবি তোলেন।
সেনেটর থাকাকালে লিন্ডসে গ্রাহাম বহুবার ইসরায়েল সফর করেছেন। দেশটির বিভিন্ন সময়ের প্রধানমন্ত্রী, জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ।
চলতি বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের চিফ প্রসিকিউটর করিম খান বলেছেন, ইসরায়েলি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আইসিসিতে ওয়ারেন্ট ইস্যুর চেষ্টা ঠেকাতে যেসব আমেরিকান ব্যক্তি তৎপর ছিলেন, গ্রাহাম ছিলেন তাদের অগ্রভাগে।
সর্বশেষ ইরান যুদ্ধের সময়েও তেহরানের বিরুদ্ধে আরও কড়া সামরিক হামলার পক্ষে বড় গলায় প্রচার চালিয়েছেন গ্রাহাম।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের সময়ে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালী দখল করার আহ্বান হোয়াইট হাউজকে জানিয়েছেন গ্রাহাম এবং তেহরানের সঙ্গে সংঘাতকে তুলনা করেছিলেন নাৎসি জার্মানির সঙ্গে ব্রিটেনের যুদ্ধের সঙ্গে।