প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬
দুই দশকের বেশি সময় ধরে আইনের প্রয়োগ ঘটাতে গিয়ে বিচার বহির্ভূত হত্যাসহ নানা বিতর্কের জন্ম দেওয়া এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে নতুন নামে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাহিনীর মূল দায়িত্বে বড় কোনো পরিবর্তন না আনলেও নতুন আইনে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে যুক্ত করা হয়েছে একাধিক বিধান।
এর মধ্যে রয়েছে এসআরবির কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অন্যায় আচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার বা হয়রানির অভিযোগ করতে পারবেন সাধারণ নাগরিক। এসব অভিযোগ তদন্ত ও নিষ্পত্তির জন্য গঠন করা হবে একটি অভিযোগ প্রতিকার কমিটি। এ লক্ষ্যে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ এর খসড়া জনমত গ্রহণের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। খসড়ায় বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে এসআরবি গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বাহিনীর দায়িত্ব, অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা, মামলা তদন্ত, সদস্যদের শৃঙ্খলা এবং নাগরিক অভিযোগ নিষ্পত্তির বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
র্যাবের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিচারবহির্ভূত হত্যা, ক্রসফায়ার, গুম, হেফাজতে নির্যাতন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব ও এর কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পরে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও বাহিনীটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করে।
খসড়া অনুযায়ী, এসআরবি হবে বাংলাদেশ পুলিশের অধীন একটি বিশেষায়িত ইউনিট। এর প্রধান থাকবেন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) পদমর্যাদার একজন মহাপরিচালক। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাটালিয়ন, কোম্পানি, প্লাটুন ও সেকশন গঠন করা যাবে। সদর দপ্তর থাকবে ঢাকায়, তবে দেশের যেকোনো স্থানে ইউনিট স্থাপনের সুযোগ থাকবে। পুলিশ ছাড়াও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে সদস্যদের প্রেষণে এনে বাহিনীটি গঠন করা যাবে। প্রেষণে নিয়োগের ন্যূনতম মেয়াদ দুই বছর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
খসড়া আইন পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাহিনীর নাম পরিবর্তন হলেও দায়িত্বের পরিধিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসছে না। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার, মাদক, সন্ত্রাসবাদ, মানবপাচার, সংঘবদ্ধ ও সাইবার অপরাধ দমন এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করা এসআরবির দায়িত্ব হিসেবে রাখা হয়েছে। আদালত, সরকার কিংবা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে মামলা দায়ের ও তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতাও থাকবে বাহিনীটির।
খসড়া আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো অভিযোগ প্রতিকার কমিটি। কমিটির সভাপতি হবেন এসআরবির একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক। সদস্য হিসেবে থাকবেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা, পরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) এবং মানবাধিকার, আইন বা বিচার প্রশাসনে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সরকার মনোনীত একজন ব্যক্তি।
এই কমিটি সাধারণ নাগরিকের অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে। প্রয়োজনে পৃথক অনুসন্ধান দল গঠন করা হবে। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে কমিটি। বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, হয়রানি, অনিয়ম, অবৈধ প্রভাব বিস্তার, পদোন্নতি বা পদায়নসংক্রান্ত অভিযোগও পর্যালোচনা করতে পারবে তারা।
খসড়া আইনে সদস্যদের জন্য বিস্তারিত শৃঙ্খলাবিধিও নির্ধারণ করা হয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে মাদকাসক্ত থাকা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্য, দায়িত্বে অবহেলা, বেআইনি অর্থ আদায়, সরকারি অস্ত্র বা সরঞ্জামের অপব্যবহার, অপরাধীকে পালাতে সহায়তা কিংবা জুয়া ও অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। কোনো সদস্য পলাতক হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাটালিয়ন অধিনায়কের আবেদনের ভিত্তিতে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাকে গ্রেপ্তার করে এসআরবির কাছে হস্তান্তর করবেন।