প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হওয়ার ঠিক একদিন আগে অভ্যুত্থানের প্রধান দুই মিত্রশক্তি ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের কথার লড়াই ও স্নায়ুযুদ্ধ রক্তক্ষয়ী সংঘাতে গড়িয়েছে। একদিন আগে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু; মঙ্গলবার প্রায় কাছাকাছি সময়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ এবং সবশেষ ঢাকা আলীয়া মাদ্রাসায় দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে।
আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের শাসন এবং এরও আগে সেনা শাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং এরও আগে জোট সরকারের সময়ে দুই সংগঠনের সম্পর্ক ছিল অনেকটা উষ্ণ এবং সমান্তরাল। আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনীতিতে একই মঞ্চে হাজির হয়েছিল ছাত্রদল ও শিবির। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অধিকাংশ ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের শক্ত অবস্থান ও বিজয়ের পর দুই সংগঠনের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে। শুরুতে তা সীমাবদ্ধ ছিল বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্য ও সাংগঠনিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই দ্বন্দ্ব নেমে এসেছে রাজপথে। একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, হামলা, আহতের ঘটনা এবং কোথাও কোথাও ১৪৪ ধারা জারি হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আবারও অস্থির হয়ে উঠছে।
মঙ্গলবার একদিনেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়াসহ রাজধানীর একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এর মাত্র একদিন আগে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও দুই সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষে একাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। ধারাবাহিক এসব ঘটনার পর প্রশ্ন উঠছে, এগুলো কি বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, নাকি জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিফলন?
জবিতে শুরু, হাসপাতালে হামলার অভিযোগ
সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ইউজিসি চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ আলোকচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ ঘটনায় জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, জিএস আব্দুল আলিম আরিফ, ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ইয়াসিন সাইফসহ কয়েকজন আহত হন। সংঘর্ষের সময় দায়িত্ব পালনরত কয়েকজন সাংবাদিকও হামলার শিকার হন।
সংঘর্ষে আহতদের চিকিৎসার জন্য ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে আবারও হামলার অভিযোগ ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে আহত শিক্ষার্থী, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী, সাংবাদিক এমনকি সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনরাও হামলার শিকার হন। এ ঘটনায় হাসপাতাল এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
ঘটনার পর জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম নিজের ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘দ্বিতীয় ক্যাম্পাস আর অস্থায়ী আবাসনের দাবিতে আজকের এই হামলার শিকার হয়েছি। রক্ত দিলেও এই পেটুয়াদের কাছে ক্যাম্পাস দেওয়া হবে না, ইনশাআল্লাহ।’
ঢাকা কলেজেও সংঘর্ষ
একই দিন দুপুরে ঢাকা কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তোলে।
ছাত্রশিবিরের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠানস্থল সাজানোর সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালান। এতে তাদের কয়েকজন আহত হন। অন্যদিকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও সংঘর্ষে নিজেদের নেতাকর্মী আহত হওয়ার দাবি করা হয়। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষে দুই পক্ষ মিলিয়ে অন্তত ২৭ জন আহত হয়েছেন।
সংঘাত ঢাকা আলিয়ায়: বিকেলে রাজধানীর সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়াতেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। হলের সিট দখলকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ দ্রুত সহিংস রূপ নেয়। পুলিশের উপস্থিতিতেই উভয় পক্ষ ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় জড়িয়ে পড়ে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও এলাকায় থমথমে পরিবেশ বিরাজ করে।
বেরোবিতে সংঘর্ষের পর ১৪৪ ধারা:
এর একদিন আগে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’উপলক্ষে আয়োজিত একটি প্রদর্শনীতে ব্যানার প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী আহত হন, যার মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর।
পরদিন দুই সংগঠন একই সময়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করলে সংঘর্ষের আশঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্যাম্পাসে ১৪৪ ধারা জারি করে।
ছাত্ররাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে নতুন করে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সাংগঠনিক আধিপত্য, ছাত্র সংসদ নির্বাচন, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের অবস্থান এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও পড়ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ শিক্ষার্থীরা: রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। সংঘর্ষের কারণে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে, আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে ক্যাম্পাসে, বিঘ্নিত হচ্ছে একাডেমিক কার্যক্রম। কোথাও কোথাও প্রশাসনকে ১৪৪ ধারা জারি কিংবা অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে মতপার্থক্য ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হলেও সেই মতবিরোধ যখন সংঘর্ষ, হামলা ও সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো শিক্ষাঙ্গণ। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কেবল দুটি ছাত্রসংগঠনের বিরোধ নয়, বরং দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। তাই শুধু সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণ নয়, এর পেছনের কারণ, প্রভাব এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করাও এখন জরুরি। অন্যথায় একটি ক্যাম্পাসের উত্তাপ খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়তে পারে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও।