প্রতিবেদক, ক্যাম্পাস মিরর প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ বিমান হামলায় ইরাকে ইরান–সমর্থিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের (পিএমএফ) অন্তত ২০ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা এবং প্রায় একই সময়ে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। কয়েক সপ্তাহের আপেক্ষিক শান্তির পর এ ধরনের সমন্বিত সামরিক অভিযান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত আবারও সরাসরি সামরিক পর্যায়ে ফিরে যেতে পারে। ফলে শুধু ইরাক বা জর্ডান নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই অভিযানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, সৌদি আরব প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব ও ইরান মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হলেও তারা সাধারণত প্রক্সি সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এবার সরাসরি যৌথ অভিযানে সৌদির অংশগ্রহণ আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব দাবি করেছে, সৌদি তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলার জবাব হিসেবে পিএমএফের ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে ইরান ও পিএমএফ একে ইরাকের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেছে। ফলে সামরিক অভিযানের পাশাপাশি কূটনৈতিক বিরোধও আরও তীব্র হয়েছে।
ইরাক দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রধান ক্ষেত্র। দেশটির নিরাপত্তা কাঠামোর একটি অংশ হিসেবে পিএমএফ কাজ করলেও এর বিভিন্ন অংশের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাই পিএমএফের ওপর হামলা কেবল একটি মিলিশিয়া গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান নয়; এটি কার্যত ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবের ওপরও আঘাত।
ইরাকের সরকার হামলার নিন্দা জানিয়ে জরুরি বৈঠক ডেকেছে। এতে বোঝা যায়, বাগদাদ একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে ইরান–ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর চাপও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ফলে ইরাকের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি এবং হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকার লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ স্পষ্টভাবে দেখায়, তেহরান সংঘাতকে শুধু ইরাকে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ—উভয় ক্ষেত্রেই চাপ সৃষ্টি করার কৌশল নিয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হামলা প্রতিহত করার দাবি করলেও, ইরানের উদ্দেশ্য সম্ভবত সামরিক ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বার্তা দেওয়া—যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো নিরাপদ নয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের "চড়া মূল্য দিতে হবে" মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে ওয়াশিংটন আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, ইরাকি সরকারের সমন্বয়েই হামলা চালানো হয়েছে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সমালোচনা কমানোর চেষ্টা করছে এবং অভিযানকে বৈধতা দেওয়ার বার্তা দিচ্ছে।
তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এ ধরনের প্রতিশোধমূলক অভিযানের ফলে ইরান–সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো আরও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্রদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে। সৌদি আরব এতদিন ইরানের বিরুদ্ধে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা বজায় রাখলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টাও দেখা গিয়েছিল। কিন্তু এবার প্রকাশ্যে সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া সেই সমীকরণকে বদলে দিতে পারে।
এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন নিরাপত্তা জোট গড়ে ওঠার সম্ভাবনা যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি সৌদি আরব নিজেও ইরান–সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর প্রত্যক্ষ হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব: হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। সেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে।
যদি সংঘাত লোহিত সাগর ও হরমুজ উভয় অঞ্চলে বিস্তৃত হয়, তাহলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপ ও এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তাও সরাসরি প্রভাবিত হবে।
পাকিস্তান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন করে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলার মধ্য দিয়ে পূর্বে হওয়া সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়েছে। ফলে কূটনৈতিক উদ্যোগ এখন অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উভয় পক্ষই আপাতত সীমিত সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ ধরে রাখতে চাইবে। তবে কোনো ভুল হিসাব বা বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে সংঘাত দ্রুত পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি আরবের যৌথ হামলা এবং জর্ডানে ইরানের পাল্টা আঘাত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই ঘটনাগুলো শুধু একটি প্রতিশোধমূলক সামরিক অভিযান নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, সৌদি আরব এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে শক্তির নতুন বিন্যাসের ইঙ্গিত বহন করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো সংঘাতের ভৌগোলিক বিস্তার। ইরাক, জর্ডান, হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগর এবং উপসাগরীয় অঞ্চল একই সংঘাতচক্রে জড়িয়ে পড়লে তার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই সামরিক প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগই এখন মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর যুদ্ধ এড়ানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ।