নুসরাত রুবাইয়া নিশাত প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬
বুক রিভিউ
রিভিউয়ার: নুসরাত রুবাইয়া নিশাত
আপনি কি কখনো করাত শ্রমিক পেশার নাম শুনেছেন? হয়তো শুনেছেন, হয়তো শোনেননি। কারণ হাওড়ে বসবাস করা এই জনগোষ্ঠীর পেশা এবং তাদের ঐতিহাসিক জীবনযাপন নিয়ে এখন আর তেমন কোথাও আলোচনা হয় না।
নেত্রকোনার লেখিকা শুক্লা পঞ্চমী তাঁর লেখা "ছৈ" উপন্যাসে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন কঠিন মনোবল ও দৃঢ়তার সঙ্গে লড়াই করে যাওয়া মানুষগুলোর জীবন।
করাতি, যারা কাঠ কাটে। কাঠ কেটে মধ্যনগর, সুনামগঞ্জ, ঠাকরকোণা, দশদ্বার, সচনা, নেত্রকোণা এবং বড় বড় আড়তগুলোতে যায় কেনাবেচা করতে। তাদের একটি আলাদা এলাকা আছে, যার নাম করাতপাড়া। এই করাতপাড়ার মানুষগুলো সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কর্মব্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই করাতপাড়ারই এক সাধারণ ঘরের বউ ‘বাঁশি’। খুব ছোট বয়সে বিয়ে করে সে এই পাড়ায় আসে সংসারের আশায়। কিন্তু ভাগ্য কি আর সবার সহায় হয়!
বিয়ের দুই বছর পর বাঁশিকে ছেড়ে তার স্বামী গৃহত্যাগী হয়। আর ফেরে না। দেখতে দেখতে বারো বছর কেটে যায়, মনোহর আর ফেরে না। কিন্তু সিঁথিতে সিঁদুর পরা থেকে কখনো বিরত হয় না বাঁশি। সে যেন হয়ে ওঠে করাতপাড়ার না-হওয়া বউ, না-হওয়া মেয়ে। শুধু থেকে যায় সেখানে। জীবনের ধারায় বাঁশিরও কখনো কখনো মনে হয়, তার একজন সঙ্গীর প্রয়োজন। আর সেই সুযোগ নেওয়ার জন্য ওত পেতে থাকে অনেক হিংস্র মানুষ।
বাঁশির জীবনের সঙ্গে সঙ্গে করাতপাড়াতেও যেন চলে উত্থান-পতন। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অজপাড়াগুলোতেও যখন সাজসাজ রব উঠেছিল, তখন খড়ের আবরণ ফেলে ক্রমশ টিনের চালে ঢেকে যাচ্ছিল ঘরবাড়ি। হঠাৎ দমকা হাওয়ার রদবদলে খুব দ্রুত ওলটপালট হতে লাগল করাতপাড়ার প্রেক্ষাপট। চোখ ফুটে গেলে পাখিকে যেমন নীড়ে আটকে রাখা যায় না, তেমনি আধুনিকতার হাওয়া থেকে মানুষের গতিরোধ করাও সম্ভব নয়। করাতপাড়া ধীরে ধীরে যেন হয়ে উঠতে চায় কর্পোরেট পাড়া।
গল্পে জীবনযুদ্ধের পাশাপাশি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে হাওড় এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। হাওড়ে বৃষ্টি হলে তা কতটা মনোমুগ্ধকর হতে পারে, তা লেখিকা নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। সবচেয়ে চমৎকার যে বিষয়টি লেগেছে, তা হলো লেখনীতে পরিপূর্ণভাবে আঞ্চলিকতার উপস্থিতি। প্রতিটি বাক্য ও সংলাপ এমনভাবে সাজানো, যেন পাঠক নিজেকে হাওড়ের করাতপাড়ার একজন মানুষ হিসেবে কল্পনা করতে পারেন।
বাঁশির জীবন কাটে দোটানায়। জীবনে চলে নানান অনুভূতির টানাপোড়েন। গল্পে আসে আরও নতুন কিছু চরিত্র, যারা বাঁশিকে ঘিরে আবর্তিত হয়। একই সঙ্গে সমাজের কুসংস্কারের জাল বারবার তাকে আটকে ধরতে চায়। যতই বাঁশি নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করে, ততই অশিক্ষিত সমাজ তাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে চায়।
বাঁশির জীবন একদিকে জীবনের বসন্ত, অন্যদিকে বিবেকের তাড়না। কীভাবে শেষ হয় বাঁশির গল্প? সে কি সমাজের জালে আটকে যায়, নাকি মুক্ত আকাশে ডানা মেলে? নাকি কোনো এক সাধুর পরামর্শ তার জীবনটাকে বন্দি করে ফেলে কোনো গোপন বাক্সে?
বাঁশির এই দীর্ঘ বারো বছরের অপেক্ষার জীবন শুধু দায়িত্ব আর অপারগতার গল্প নয়; বরং এটি কট্টর, পিছিয়ে পড়া সমাজের মাঝে নিজের অসহায় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ প্রয়াসের গল্প। করাতপাড়ার প্রতিটি কোণায় যখন কুসংস্কার আর অন্ধকার ছড়িয়ে পড়েছে, তখন বাঁশিকে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হয়েছে লোকলজ্জা ও বদনামের বিরুদ্ধে।
লেখিকা এই বইতে কোনো মেলোড্রামা ছাড়াই দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি সাধারণ মেয়ে আত্মদংশন এবং সমাজের রক্তচক্ষুর বেড়াজালে আটকে পড়ে। পাশাপাশি হাওড় অঞ্চলের অবহেলিত ও অভাবী করাত শ্রমিকদের জীবনযাত্রা এবং আধুনিকতার আগ্রাসনে তাদের চিরচেনা পরিবেশ বদলে যাওয়ার প্রবণতা উপন্যাসটিকে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।
শেষ পর্যায়ে বইটির প্রোডাকশন কোয়ালিটি নিয়ে কিছু না বললেই নয়। বইটির বাইন্ডিং, পৃষ্ঠার মান এবং প্রচ্ছদ চমৎকার। সম্পাদনাও অত্যন্ত নিখুঁতভাবে করা হয়েছে, যা গল্পের শুরু থেকেই বোঝা যায়। প্রসিদ্ধ পাবলিশার্স বর্তমানে ভালো মানের বই প্রকাশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। ‘ছৈ’ তারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।