সাদিয়া বিনতে সিদ্দিক প্রকাশিত: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬
ঢাকা শহরে বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতার অভিশাপে ডুবে যায়। অল্প বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি পানিতে ডুবে যায়, যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়, জনজীবন বিপর্যস্ত হয়। এই সমস্যা নতুন নয়; দশকের পর দশক ধরে চলে আসা অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল-জলাধার দখল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এর মূল কারণ। তবে সময় এসেছে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের। সরকার, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ঢাকাকে জলাবদ্ধতামুক্ত করা সম্ভব।
জলাবদ্ধতার প্রধান কারণসমূহ
ঢাকার জলাবদ্ধতার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে:
১. খাল ও জলাধারের দখল ও ভরাট: একসময় ঢাকায় অসংখ্য খাল ও জলাশয় ছিল যা প্রাকৃতিকভাবে পানি নিষ্কাশন করত। বর্তমানে অনেক খাল দখল হয়ে গেছে বা ভরাট হয়ে সরু নালায় পরিণত হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, শহরের জলাধারের পরিমাণ মাত্র ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
২. অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও কংক্রিটায়ন: রাস্তা, ভবন নির্মাণে মাটির পরিবর্তে কংক্রিট ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হতে পারে না। ফলে পানি রাস্তায় জমে যায়।
৩. ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা: নালা, ড্রেন ও বক্স কালভার্ট নিয়মিত পরিষ্কার না করায় পলি, প্লাস্টিক ও আবর্জনায় ভরে যায়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মতে, প্রয়োজনের তুলনায় পাম্পিং স্টেশন অনেক কম।
৪. বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব: নাগরিকদের অসচেতনতায় নালায় পলিথিন, প্লাস্টিক ও গৃহস্থালি আবর্জনা ফেলা হয়, যা পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেয়।
৫. জলবায়ু পরিবর্তন: অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও নদীগুলোর স্তর বৃদ্ধি পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি করে।
এই সমস্যার ফলে যানজট, রোগব্যাধি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক ক্ষতি ও জীবনযাত্রার মান হ্রাস পায়।
জলাবদ্ধতা নিরসনে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি করণীয়
সমাধানের জন্য স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ (বর্ষার আগে):
• সকল নালা, ড্রেন, ক্যাচপিট ও বক্স কালভার্ট নিয়মিত পরিষ্কার করা।
• খাল খনন ও পলি অপসারণ।
• পাম্পিং স্টেশনগুলো সচল রাখা এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত পোর্টেবল পাম্প ব্যবহার।
• জনসচেতনতা বৃদ্ধি: নালায় আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে প্রচারণা চালানো।
মধ্যমেয়াদি পদক্ষেপ:
• অবৈধ দখলমুক্ত করে খাল পুনরুদ্ধার ও খনন (যেমন: জিয়া সরণী, শ্যামপুর, কাজলা খাল ইত্যাদি)।
• নতুন আউটলেট নির্মাণ যাতে পানি বুড়িগঙ্গা বা অন্যান্য নদীতে দ্রুত নিষ্কাশিত হয়।
• রেইনওয়াটার হারভেস্টিং ব্যবস্থা চালু করা — ছাদের পানি সংরক্ষণ ও ভূগর্ভস্থ রিচার্জ।
• জলাধার সংরক্ষণ ও নতুন রিটেনশন পন্ড নির্মাণ।
দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ:
• ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন: ঢাকা ওয়াসা ও সিটি কর্পোরেশনের সমন্বয়ে সমন্বিত ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। বিশ্বব্যাংক ও আইডব্লিউএমের সহায়তায় এটি দ্রুত করা যেতে পারে।
• পরিকল্পিত নগরায়ণ: নতুন ভবন নির্মাণে জলাধার সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা এবং পার্মিয়েবল সারফেস (যেমন: ফাঁপা ইট) ব্যবহার।
• নদী খনন: বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী খনন করে পানি প্রবাহ সচল রাখা।
• স্মার্ট মনিটরিং: সেন্সর ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে পানির স্তর নিয়ন্ত্রণ।
• আইন প্রয়োগ: খাল দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন কার্যকর করা।
সরকার ইতিমধ্যে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি তিন স্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি খাল খনন, নালা পরিষ্কার ও হটস্পট চিহ্নিতকরণে কাজ করছে। এগুলোকে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
নাগরিকদের ভূমিকা
জলাবদ্ধতা নিরসন শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। প্রত্যেক নাগরিককে দায়িত্বশীল হতে হবে:
• নালায় কোনো আবর্জনা না ফেলা।
• বর্জ্য সঠিক স্থানে ফেলা।
• স্থানীয় খাল-জলাধার রক্ষায় সচেতন থাকা।
• সরকারি উদ্যোগে সহযোগিতা করা।
ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে হলে আমাদের সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে। খাল উদ্ধার, ড্রেনেজ উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে আমরা জলাবদ্ধতামুক্ত ঢাকা গড়ে তুলতে পারি। সময় আর অপেক্ষা করার নয় — এখনই পদক্ষেপ নিন, ঢাকাকে বাঁচান।