Logo
ঢাকা রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
Logo

ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি জরুরি আহ্বান

সাদিয়া বিনতে সিদ্দিক প্রকাশিত: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬

শেয়ার করুনঃ
ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি জরুরি আহ্বান


ঢাকা শহরে বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতার অভিশাপে ডুবে যায়। অল্প বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি পানিতে ডুবে যায়, যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়, জনজীবন বিপর্যস্ত হয়। এই সমস্যা নতুন নয়; দশকের পর দশক ধরে চলে আসা অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল-জলাধার দখল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এর মূল কারণ। তবে সময় এসেছে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের। সরকার, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ঢাকাকে জলাবদ্ধতামুক্ত করা সম্ভব।

জলাবদ্ধতার প্রধান কারণসমূহ

ঢাকার জলাবদ্ধতার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে:

১. খাল ও জলাধারের দখল ও ভরাট: একসময় ঢাকায় অসংখ্য খাল ও জলাশয় ছিল যা প্রাকৃতিকভাবে পানি নিষ্কাশন করত। বর্তমানে অনেক খাল দখল হয়ে গেছে বা ভরাট হয়ে সরু নালায় পরিণত হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, শহরের জলাধারের পরিমাণ মাত্র ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

২. অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও কংক্রিটায়ন: রাস্তা, ভবন নির্মাণে মাটির পরিবর্তে কংক্রিট ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হতে পারে না। ফলে পানি রাস্তায় জমে যায়।

৩. ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা: নালা, ড্রেন ও বক্স কালভার্ট নিয়মিত পরিষ্কার না করায় পলি, প্লাস্টিক ও আবর্জনায় ভরে যায়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মতে, প্রয়োজনের তুলনায় পাম্পিং স্টেশন অনেক কম।

৪. বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব: নাগরিকদের অসচেতনতায় নালায় পলিথিন, প্লাস্টিক ও গৃহস্থালি আবর্জনা ফেলা হয়, যা পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেয়।

৫. জলবায়ু পরিবর্তন: অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও নদীগুলোর স্তর বৃদ্ধি পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি করে।

এই সমস্যার ফলে যানজট, রোগব্যাধি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক ক্ষতি ও জীবনযাত্রার মান হ্রাস পায়।

জলাবদ্ধতা নিরসনে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি করণীয়

সমাধানের জন্য স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ (বর্ষার আগে):

•  সকল নালা, ড্রেন, ক্যাচপিট ও বক্স কালভার্ট নিয়মিত পরিষ্কার করা।

•  খাল খনন ও পলি অপসারণ।

•  পাম্পিং স্টেশনগুলো সচল রাখা এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত পোর্টেবল পাম্প ব্যবহার।

•  জনসচেতনতা বৃদ্ধি: নালায় আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে প্রচারণা চালানো।

মধ্যমেয়াদি পদক্ষেপ:

•  অবৈধ দখলমুক্ত করে খাল পুনরুদ্ধার ও খনন (যেমন: জিয়া সরণী, শ্যামপুর, কাজলা খাল ইত্যাদি)।

•  নতুন আউটলেট নির্মাণ যাতে পানি বুড়িগঙ্গা বা অন্যান্য নদীতে দ্রুত নিষ্কাশিত হয়।

•  রেইনওয়াটার হারভেস্টিং ব্যবস্থা চালু করা — ছাদের পানি সংরক্ষণ ও ভূগর্ভস্থ রিচার্জ।

•  জলাধার সংরক্ষণ ও নতুন রিটেনশন পন্ড নির্মাণ।

দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ:

•  ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন: ঢাকা ওয়াসা ও সিটি কর্পোরেশনের সমন্বয়ে সমন্বিত ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। বিশ্বব্যাংক ও আইডব্লিউএমের সহায়তায় এটি দ্রুত করা যেতে পারে।

•  পরিকল্পিত নগরায়ণ: নতুন ভবন নির্মাণে জলাধার সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা এবং পার্মিয়েবল সারফেস (যেমন: ফাঁপা ইট) ব্যবহার।

•  নদী খনন: বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী খনন করে পানি প্রবাহ সচল রাখা।

•  স্মার্ট মনিটরিং: সেন্সর ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে পানির স্তর নিয়ন্ত্রণ।

•  আইন প্রয়োগ: খাল দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন কার্যকর করা।

সরকার ইতিমধ্যে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি তিন স্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি খাল খনন, নালা পরিষ্কার ও হটস্পট চিহ্নিতকরণে কাজ করছে। এগুলোকে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

নাগরিকদের ভূমিকা

জলাবদ্ধতা নিরসন শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। প্রত্যেক নাগরিককে দায়িত্বশীল হতে হবে:

•  নালায় কোনো আবর্জনা না ফেলা।

•  বর্জ্য সঠিক স্থানে ফেলা।

•  স্থানীয় খাল-জলাধার রক্ষায় সচেতন থাকা।

•  সরকারি উদ্যোগে সহযোগিতা করা।

ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে হলে আমাদের সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে। খাল উদ্ধার, ড্রেনেজ উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে আমরা জলাবদ্ধতামুক্ত ঢাকা গড়ে তুলতে পারি। সময় আর অপেক্ষা করার নয় — এখনই পদক্ষেপ নিন, ঢাকাকে বাঁচান।


Campus Mirror
শেয়ার করুনঃ

এই বিভাগের আরোও খবর

  • প্রান্তিক মানুষের সংগ্রাম, জীবনগাঁথা ও পরিবর্তনের আখ্যান "ছৈ"
    প্রান্তিক মানুষের সংগ্রাম, জীবনগাঁথা ও পরিবর্তনের আখ্যান "ছৈ"
  • ইরান যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি বিশ্বশান্তির নতুন সম্ভাবনা
    ইরান যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি বিশ্বশান্তির নতুন সম্ভাবনা
  • সুপ্রিয় পাঠকগণ
    সুপ্রিয় পাঠকগণ
Logo